গত এক বছরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত বিস্তৃত আমদানি শুল্কের বড় অংশ বাতিল করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। তবে এর পরের দিনই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করতে চান।
স্থানীয় সময় শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আদালত তার ক্ষমতায় লাগাম টানলেও তিনি শুল্ক বাড়ানোর নীতি অব্যাহত রাখতে চান। বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি নতুনভাবে সাজানো এবং আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার হিসেবেই তিনি শুল্ককে ব্যবহার করে আসছেন।
শুক্রবার আদালত জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় প্রায় সব দেশের ওপর ট্রাম্প আরোপিত শুল্ক বাতিল করে দেয়। তবে বিপরীতে তিনি জানিয়েছেন, তুলনামূলক সীমিত হলেও ভিন্ন আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করবেন তিনি।
আগামী মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্টেট অব দ্য ইউনিয়নে ভাষণ দেবেন। তিনি ইতোমধ্যে এমন একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, যার মাধ্যমে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ওইদিন থেকেই বিশ্বব্যাপী আমদানির ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপ করা যাবে। তবে আইন অনুযায়ী, এই শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে, যদি না আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তার মেয়াদ বাড়ানো হয়।
তবে শুল্ক ১৫ শতাংশ নির্ধারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প হালনাগাদ আদেশে কবে সই করবেন—এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিক কিছু জানায়নি।
ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে লিখেছেন, আগের দিনের ‘অযৌক্তিক, দুর্বলভাবে রচিত এবং চরমভাবে আমেরিকাবিরোধী’ শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার ভিত্তিতেই তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ৬-৩ ভোটের ব্যবধানে রায় দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের এককভাবে শুল্ক নির্ধারণ বা পরিবর্তন করা অসাংবিধানিক। কারণ কর আরোপের ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত।
অন্যদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, বাণিজ্য বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন এমন ফেডারেল আইনের অন্যান্য ধারার মাধ্যমেও তিনি শুল্ক আরোপের পথ খুঁজছেন।
তিনি বলেন, আগামী কয়েক মাসে ‘আইনসম্মত নতুন শুল্ক’ নির্ধারণ ও জারি করবে আমাদের প্রশাসন যা আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলার আমাদের অসাধারণ সফল প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।’
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর মার্কিন প্রেডিডেন্ট তার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বিচারপতিদের ওপর অস্বাভাবিক ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়েছেন। এমনকি তার প্রথম মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি নিল গোরসাচ এবং অ্যামি কোনি ব্যারেটকেও তিনি ছাড়েননি।
শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, এই পরিস্থিতি তাদের পরিবারের জন্যও একটি লজ্জাজনক বিষয়।
ওইদিন রাতে তিনি সামাজিকমাধ্যমে গরসাচ, ব্যারেট ও প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসকেও সমালোচনা করেন।
পরদিন (শনিবার) সকালে আরেক পোস্টে তিনি বিচারপতি ব্রেট কাভানফকে ‘নতুন নায়ক’ আখ্যা দেন, যিনি এই রায়ের বিপক্ষে ৬৩ পৃষ্ঠার একটি ভিন্নমত পোষণকারী নোট লিখেছেন। এ ছাড়াও তিনি বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস এবং স্যামুয়েল আলিতোরও প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, কারও মনেই সন্দেহ নেই যে তারা আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলতে চান।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিতে শুল্ক ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। তার দাবি, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মার্কিন উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং মাদক পাচার দমন বা দেশগুলোর মধ্যে সংঘাত বন্ধে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তবে তিনি বারবার বলেছেন, বিদেশি সরকারগুলোই এসব শুল্ক দেবে, মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়।
ফেডারেল তথ্য অনুযায়ী, জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টের আরোপিত আমদানি শুল্ক থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কোষাগারে ১৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি জমা হয়েছে। এই অর্থ জাতীয় ঋণ পরিশোধ বা করদাতাদের লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা এই বিপুল অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কিছু বলা হয়নি।
এদিকে, ট্রাম্পের নতুন এই শুল্ক হুমকির পর ডেমোক্র্যাটরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। হাউস ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেন, উচ্চ শুল্ক ঘোষণা করে ট্রাম্প ‘আমেরিকান জনগণের পকেট কেটে নিচ্ছেন।’
তাদের ভাষ্য, শুল্ক অবৈধ ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি খরচ বাড়ানোর পথ খুঁজছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্যাভিন নিউসম বলেন, তিনি আপনাদের কথা ভাবেন না।