বিশেষ-সংবাদ
ঋতু পরিবর্তনে ফরিদপুরে শিশুদের অসুখ বাড়ছে, হাসপাতালে ভিড়
শীত শেষে বসন্তের আগমনের মধ্যে আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে ফরিদপুরে শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে সর্দিকাশি, জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। চিকিৎসকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি।
মৌসুম বদলের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ফরিদপুরের একমাত্র বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক রোগীর উপস্থিতি। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে সিরিয়ালের জন্য।
হাসপাতালটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আক্কাস মন্ডল জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রতিদিন শুধু আউটডোরে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী আসছে। ইনডোরেও প্রতিদিন সিট সংকট দেখা দিচ্ছে।
১ দিন আগে
নদীভাঙন ও বেকারত্বে জর্জরিত কুড়িগ্রাম, নতুন সরকারের কাছে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রত্যাশা
নতুন সরকারকে ঘিরে কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের প্রত্যাশা এবার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে পিছিয়ে পড়া এ জনপদের মানুষ প্রতিশ্রুতি নয়, চান বাস্তব ও টেকসই পরিবর্তন।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা এই জেলা প্রতি বছর ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়ে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ অন্তত ১৬টি নদী জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদীর ভাঙনে প্রতি বছর শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। বসতভিটা, আবাদি জমি, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী শাসনের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। অস্থায়ী বাঁধ ও প্রকল্পে কাজ চালিয়ে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করেন তারা। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত নদী খনন ও বিজ্ঞানসম্মত নদী শাসন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
একইসঙ্গে কর্মসংস্থানের অভাব কুড়িগ্রামের আরেক বড় সংকট। শিল্পকারখানা না থাকায় শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত যুবকদের বড় একটি অংশ কাজের সন্ধানে ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবার ভেঙে পড়ছে, সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন এবং উদ্যোক্তা সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করা গেলে এই জেলার কর্মসংস্থানের চিত্র বদলে যেতে পারে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজের অভাব। পরিবার রেখে দূরে যেতে চাই না। নতুন সরকারের কাছে একটাই দাবি, কুড়িগ্রামে কাজের ব্যবস্থা করুন।’
যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চরের যুবক সাহিনুর রহমান বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করেও বসে আছি। এখানে যদি কারখানা থাকত, এখানেই চাকরি করা যেত। বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতে হয়।’
একই উপজেলার বদলী পাড়ার শাজাহান আলী বলেন, ‘নদীভাঙনে সব হারিয়েছি। প্রতি বছর নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচি। আমরা স্থায়ী সমাধান চাই।’
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার এক নেতার মতে, জেলার প্রায় ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১৬ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনে মানুষ বারবার ঠিকানা বদলাতে বাধ্য হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বহু এনজিও কাজ করলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরাদ্দ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘অবহেলিত কুড়িগ্রামের উন্নয়নে নদীভাঙন রোধ, চরাঞ্চলের জীবনমান উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি। জাতীয় সংসদ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু; সুষম বণ্টন নিশ্চিত হলেই কুড়িগ্রামের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।’
তাই এবার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার যেন কাগুজে পরিকল্পনার গণ্ডি পেরিয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়। নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে বদলে যাবে কুড়িগ্রাম জেলার চিত্র। দূর হবে হতাশা, জাগবে নতুন স্বপ্ন।
১ দিন আগে
সিলেটে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, মানা হচ্ছে না সিসিকের মূল্যতালিকা
শুরু হলো পবিত্র মাহে রমজান মাস। রোজার শুরুতেই সিলেট মহানগরীতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির চিত্র দেখা গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাছ, মাংস, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নগরীর আম্বরখানা, বন্দরবাজার, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার ও কাজিরবাজার এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, মাংস ও মাছের দোকানগুলোতে আগের তুলনায় বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। রমজানের শুরুতে মাংসের চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ব্রয়লার মুরগির দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি যে মুরগি ১৬৫ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল, তা এখন স্থানভেদে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রায় সব ধরনের মাছেই কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
ফলমূলের বাজারেও ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে। ইফতারে বহুল ব্যবহৃত কলার দাম হালিপ্রতি আকারভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি আপেল ও কমলার দামও আগের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
লেবু ও শসার দামেও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। কয়েকদিন আগেও যে লেবু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় হালি বিক্রি হয়েছিল, তা এখন আকারভেদে ৯০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শসা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়েছে।
নগরীর তালতলা এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাদির বলেন, রমজান এলেই বাজারে চাপ বাড়ে, তবে এবার আগেভাগেই দাম বেড়ে গেছে। নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের দামের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বন্দরবাজারের এক মাংস বিক্রেতা জানান, সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম এবং চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ কারণেই বাজারে দাম সমন্বয় হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
উল্লেখ্য, গত ৯ ফেব্রুয়ারি সিলেট নগরভবনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাতে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার রমজানে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির আহ্বান জানান। সেখানে গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৬৫০ টাকা, খাসির মাংস ১১০০ টাকা, ছাগল ও ভেড়ার মাংস ১০০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। বাজারে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ভেজাল প্রতিরোধ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিক্রেতারা এই তালিকার পরিবর্তে সিসিককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মূল্য তালিকা না টাঙিয়ে বিক্রি করছেন প্রকাশ্যেই। নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
তারা বলছেন, নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকায় কেউ নির্ধারিত মূল্য মানছেন না। নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। একই বাজারে ভিন্ন দোকানে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে গরু ও খাসির মাংস।
ক্রেতারা বলছেন, রমজান উপলক্ষে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হলে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। বর্তমানে বাজারের অস্থিরতা রোজাদারদের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে।এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। সিসিকের নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে মাংস বিক্রি করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২ দিন আগে
‘দুর্গ’ রংপুরে অস্তিত্ব সংকটে জাতীয় পার্টি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের একটিতেও জিততে পারেননি জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে রংপুরকে নিজেদের রাজনৈতিক ‘দুর্গ’ হিসেবে দাবি করে আসা দলটি এবার সেখানেই চরম ভরাডুবির মুখে পড়েছে। একসময় দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরে এই অঞ্চলে জাপার যে শক্ত ভিত গড়ে উঠেছিল, এবারের নির্বাচনে তা কার্যত তছনছ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দলটির প্রার্থীরা জামানতও হারিয়েছেন।
এ বিষয়ে জাপার সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর-৫ আসনের প্রার্থী বলেন, আমরা হেরেছি বেশ কিছু কারণে। তার মধ্যে অন্যতম কারণ আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তি একেবারেই নেই। এছাড়া আমরা ক্ষমতার অংশ থাকলেও রংপুর অঞ্চলে দৃশ্যমান উন্নয়ন করতে পারিনি।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার রাতেই লাঙ্গল সামনে রেখে ‘জাতীয় পার্টির জানাজা’ শিরোনামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই সেটি ভাইরাল হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণমূলে নেতৃত্ব সংকট, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ভোটারদের সঙ্গে মৌসুমি যোগাযোগ, আস্থাহীনতা, জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ এবং বিএনপি-জামায়াতের বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে না পারা—এসব কারণেই এমন ভরাডুবি হয়েছে। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ থাকার অভিযোগও দলটির ওপর প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু একটি পরাজয় নয়; বরং এই অঞ্চলে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ঘুরে দাঁড়াতে হলে জাপাকে তৃণমূল সংগঠন পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় ‘দুর্গ’ স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিভিন্ন আসনের ফলাফল
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ফলাফলে দেখা গেছে, রংপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মন্ডল পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৯৩০ ভোট। সেখানে জামায়াতের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট।
রংপুর-৩ আসনে দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৯০ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৯৮ ভোট।
রংপুর-৪ আসনে জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৬৪ ভোট। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।
রংপুর-৫ আসনে জাপার এস এম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১৬ হাজার ৪৯০ ভোট। জামায়াতের গোলাম রব্বানী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির অধ্যাপক মো. গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১১৬ ভোট।
রংপুর-৬ আসনে জাতীয় পার্টির নুর আলম মিয়া পেয়েছেন ১ হাজার ২৮৭ ভোট। জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. নুরুল আমিন ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। অথচ এই আসনে এক সময় শেখ হাসিনা লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীর কাছে হেরেছিলেন।
একইভাবে কুড়িগ্রামের চারটি, গাইবান্ধার পাঁচটি, লালমনিরহাটের তিনটি, নীলফামারীর চারটি, পঞ্চগড়ের দুটি, ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি এবং দিনাজপুরের ছয়টি আসনেও জাতীয় পার্টির একই চিত্র দেখা গেছে।
অতীতের শক্ত ঘাঁটি থেকে অস্তিত্ব সংকটে
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাপা রংপুর অঞ্চল থেকে ১৭টি, ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ১২টি আসন পায়। ২০১৮ সালে রংপুর বিভাগে পায় ৭টি আসন, আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে পায় ৩টি।
জোট-মহাজোট রাজনীতিতে প্রভাব কমতে থাকলেও আসনগুলো ক্রমে আওয়ামী লীগের দখলে যায়। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর ‘দোসর’ ইমেজও এবার দলটির বিপক্ষে কাজ করেছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্ব সংকট
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে জাপার সাংগঠনিক কাঠামো আগের মতো সক্রিয় ছিল না। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মীসংকট, প্রচারণায় শিথিলতা এবং নির্বাচনি কৌশলে ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় মাঠপর্যায়ে উপস্থিতিও কম ছিল।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলকে যে আবেগভিত্তিক সমর্থন দিয়েছিল, তার মৃত্যুর পর তা ধরে রাখতে পারেনি জাপা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে জিএম কাদের ও রওশনপন্থী বিভাজন তৃণমূলেও প্রভাব ফেলেছে। তৃণমূল সংগঠন ভেঙে পড়া এবং কমিটিগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে জাপার কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছায়নি। সরকারে থেকেও বিরোধী ভূমিকা—এই দ্বৈত অবস্থান ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে বলেও মত বিশ্লেষকদের।
এ অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াত সাংগঠনিকভাবে মাঠে সক্রিয় হওয়ায় জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। সাবেক ভোটব্যাংকের একটি অংশ আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকেছে। বিতর্কিত বা অজনপ্রিয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। জেলা, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দলটির প্রভাব কমেছে।
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার রাশেদা বেগম বলেন, জাপা বহু বছর আমাদের এলাকার এমপি দিয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান বা শিল্পকারখানার মতো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। আওয়ামী লীগের সময় সরকারি দল না বিরোধী দল—তা বোঝা যেত না। এলাকার মানুষের জন্য কার্যকর কিছু হয়নি, তাই মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে।
তরুণ ভোটার সোহেল রানা জানান, আমরা উন্নয়ন ও জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান দেখতে চাই। জাপা এবার আর বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারেনি।
নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে সরাসরি ১৭টিতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এবং ২টি আসনে জোটসমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হওয়ায় এ অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের বার্তা মিলছে। বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বড় ব্যবধানে জয় এবং জাতীয় পার্টির আসনশূন্য অবস্থান রংপুর অঞ্চলের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই দুই বড় ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে জাপা তৃতীয় শক্তি হিসেবে জায়গা হারিয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে মেরুকরণ তীব্র হওয়ায় রংপুরেও তার প্রভাব পড়েছে। ভোটাররা কৌশলগত ভোট দিয়েছেন। জাপা ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য বার্তা পৌঁছাতে পারেনি।
রংপুর জেলা জাপার সভাপতি আজমল হক লেবু বলেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে জাপা হেরেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের হারিয়ে দিয়েছে। এছাড়া আমাদের কিছু সাংগঠনিক সমস্যাও রয়েছে।’
৫ দিন আগে
স্কুলবহির্ভূত শিশুদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিচ্ছে সরকার
দারিদ্র্য, অভিবাসন, প্রতিবন্ধকতা কিংবা পারিবারিক সংকটের কারণে দেশের হাজারো শিশুর কাছে স্কুলশিক্ষা এখনও অধরা। দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকা এসব শিশুর জন্য এবার ‘দক্ষতাভিত্তিক বিকল্প শিক্ষা কর্মসূচি’র মতো নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
স্কুলবহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ‘অল্টারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটিস ফর আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন’ শীর্ষক এ প্রকল্প অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার নির্বাচিত কিছু উপজেলায় এটি বাস্তবায়ন করবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই)।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৪৭ কোটি ৩ লাখ টাকা সরকার দেবে এবং ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রকল্প সহায়তা হিসেবে দেবে ইউনিসেফ।
শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শেখার সুযোগ
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে, যেসব শিশু কখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি বা মাঝপথে ঝরে পড়েছে, তাদের জন্য মানসম্মত অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
তবে এটি শুধু পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের পাশাপাশি কর্মমুখীমুখী ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগও থাকবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পরিবর্তিত ও দক্ষতানির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
এ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত শিশুদের চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালানো হবে। এরপর নমনীয় পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম ও দক্ষতা মডিউল পরিচালনা, নিয়মিত তদারকি ও মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হবে।
অগ্রগতি সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সর্বজনীন প্রাথমিক ভর্তি নিশ্চিত করা, ঝরে পড়ার হার কমানো এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শিক্ষার হার বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে দৃশ্যমান। বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা সাংবিধানিক অঙ্গীকার হিসেবেও বহাল রয়েছে।
অবশ্য তারপরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কিশোর-যুবকদের প্রায় ২২ দশমিক ১০ শতাংশ এখনও নিরক্ষর। ২০২২ সালের জনশক্তি জরিপে দেখা গেছে, কর্মরত মানুষের ২৮ দশমিক ৭ শতাংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এবং ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ কেবল প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়েছে। তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের মতো মানুষ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, শৈশবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিতদের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়নে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
দ্বিতীয় সুযোগের প্রয়াস
নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এ প্রকল্প শিশুদের স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নমনীয় শিক্ষা ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয় শিক্ষাকে আরও প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ করে তুলবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্কুলবহির্ভূত শিশুদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক, মানসম্মত অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে। এতে তারা মূলধারার শিক্ষায় ফিরতে পারবে এবং আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত হবে।’
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলবহির্ভূত শিশুদের জন্য বিনিয়োগ মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে এসব শিশুদের জন্য শিশুশ্রম, দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রান্তিকতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিক্ষা ও দক্ষতার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া সুযোগকে নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তর করার লক্ষ্যেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশে আরও দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ জনশক্তি গড়ে ওঠে।
৭ দিন আগে
সরকার গঠনের পথে বিএনপি, তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে। ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে উৎসবমূখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন দেশের কোটি কোটি ভোটার।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই দেশের নানা প্রান্তের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে বাড়তে থাকে ভোটারদের ভিড়। তার মধ্যে বয়স্ক ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলা ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় গণনা। ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা স্বতস্ফূর্ত ছিল তার দেখা মেলে ভোট পড়ার হারে। গতকাল রাত ৯টার দিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানায়, কয়েকটি কেন্দ্র বাদে গড়ে ৬০.৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোটের আগের রাত পর্যন্ত নানা আশঙ্কা ও উদ্বেগের কথা শোনা গেলেও ভোটগ্রহণের দিন বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই দেশের ২৯৯টি আসনের ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। কোথাও কোথাও হাতাহাতি বা উত্তেজনার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ।
শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৯টি আসনের বেসরকারি ফল জানা গেছে। তাতে ২১০টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭২ আসন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছেন।
ফলে বিএনপির নেতৃত্বেই গঠিত হতে যাচ্ছে আগামী সরকার। নতুন এই সরকারের নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে ৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এরশাদ জমানায় ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন কাজি জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালে তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার হাতেই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যাটন।
এই দুই নেত্রীর ক্ষমতায় আসা এবং এর চূড়ায় আরোহণ করাটাও ছিল পরিস্থিতির চাহিদায়। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন খালেদা জিয়ার স্বামী এবং বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই দুই ঘটনাই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ঠেলে দিয়েছিল রাজনীতির আঙিনায়। এরপর রাজনীতির অঙ্গনে তাদের লড়াই ছিল নজরকাড়া। তবে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সেই অবস্থার অবসান ঘটছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হয়েছেন গত ৩০ ডিসেম্বর। অন্যদিকে, টানা ১৭ বছর দেশ শাসনের পর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের শাসনক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তিনিও যে আর সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন না, তা শোনা গেছে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মুখেই।
এর মধ্য দিয়ে যে নতুন নেতৃত্বের চাহিদা তৈরি হয়েছিল দেশের রাজনীতিতে, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় দুই যুগ পর লন্ডন থেকে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
দেশের ফেরার পর থেকে ভোটের মাঠ, সব জায়গায় তার প্রকাশিত পরিকল্পনার মধ্যে প্রধানতম ছিল— সবার আগে বাংলাদেশ, দেশের তরুণদের দক্ষ করে তোলা, নারীদের উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও দেশের কৃষকদের কল্যাণ।
কৃষিপ্রধান এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। আর তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী। এই তরুণ সমাজের কাঁধে ভর করেই যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে তা-ই দৃশ্যমান হয়েছে।
ওই আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্বদানকারী অধিকাংশ তরুণ নেতাকেই দেশের সাধারণ জনগণ স্বীকৃতি দিয়েছে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। ভোটের আগে সাধারণ মানুষের চোখের মণি হয়ে ওঠা শরীফ ওসমান হাদির কথাও মানুষ ভোলেনি। নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেও অকালে চলে যাওয়া এই তরুণ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বারবার; নানাজনের আলাপচারিতায়, ফেসবুক পোস্টে ফিরে এসেছেন তিনি।
তাই তারুণ্যকে সঙ্গে নিয়ে শিল্প-প্রযুক্তিখাতকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের কৃষক ও নারীর উন্নয়নই যে সত্যিকারের উন্নয়নের চাবিকাঠি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই তিনের ওপরই বারবার জোর দিয়েছেন তারেক রহমান।
এখন দেশের শাসনভার কাঁধে নিয়ে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন এই নেতা, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা।
৮ দিন আগে
ভোটের আগমুহূর্তে ‘সিদ্ধান্তহীন’ ভোটাররাই বড় নির্ণায়ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বাকি দুই দিন। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা। এখন অপেক্ষা শুধুই ভোটগ্রহণের। এমন অন্তিম মুহূর্তে এসেও ভোটারদের একটি বড় অংশ সিদ্ধান্তহীন। ফলে এই ‘অনিশ্চিত’ ভোটাররাই কোনো প্রার্থী ও দলের পাল্লা ভারী করতে হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গত ১ থেকে ২০ জুলাই পরিচালিত দেশব্যাপী ভোটারদের মনোভাব জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোটার এখনও ঠিক করেননি কাকে দেবেন। আট মাস আগে এই হার ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। সে হিসেবে এই সময়ে এসে ভোটারদের অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা অনেকটাই কেটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো।
সারা দেশের ৫ হাজার ৪৮৯ জন ভোটার এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছিলেন পুরুষ ভোটার এবং ৪৭ শতাংশ নারী। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের ৭৩ শতাংশই গ্রামের বাসিন্দা, আর ২৭ শতাংশ ছিল শহরের।
‘বিআইজিডি পালস সার্ভে: জুলাই ২০২৫—নাগরিকদের ধারণা, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক এ জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে কিছু বলতে চান না; আর ১ দশমিক ৭ শতাংশ বলেছেন, তারা ভোটই দেবেন না।
অর্থাৎ, ভোটারদের সমর্থন আদায়ে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা, জনসমাবেশ, নানা প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচেষ্টার পরও প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন।
সিদ্ধান্তহীন ভোটার গোষ্ঠী আসলে কত বড়?
শুধু বিআইজিডি পালস সার্ভেই নয়, নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে একাধিক জনমত জরিপে মিলেছে এই সিদ্ধান্তহীনতার চিত্র।
ইনোভিশন কনসালটিংয়ের পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস রাউন্ড–৩) অনুযায়ী, কাকে ভোট দেবেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভোটারদের মধ্যে দল হিসেবে বিএনপি সমর্থিত জোট সবচেয়ে এগিয়ে। ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোট দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীদের ৩১ শতাংশ। তবে জরিপের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার কোনো দলীয় প্রার্থীকে পছন্দ করবেন কিনা, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন।
ইনোভিশন কনসালটিংয়ের এই জরিপের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট। ২২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন—এ বিষয়ে তারা এখনো কিছু বলতে পারছেন না। বিপরীতে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্দিষ্ট একজন নেতার নাম বলেছেন এবং ২২ দশমিক ৫ শতাংশ অন্য কাউকে বেছে নিয়েছেন।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা আরও বেশি। তরুণদের ওপর পরিচালিত ‘ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ ভোটার কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে অনিশ্চিত; প্রার্থী, প্রতীক বা দল পছন্দ করেছেন তুলনামূলক কম অংশ।
ফলে সহজেই অনুমান করা যায়, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী নন। এই ভোটব্যাংককে উপেক্ষা করে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ কষা সত্যিই কষ্টসাধ্য।
ভোটের মাঠের চিত্র
দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের দিকে এগোলেও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নেতাদের দেশত্যাগ ও কারাবাসের কারণে দলটির সমর্থক শুধু নয়, সাধারণ নিরপেক্ষ ভোটারদের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। আর এর প্রভাবে ভোটের মাঠের সমীকরণ বদলে গেছে অনেকখানি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একজন সরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুই দল হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। এখন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তারা দীর্ঘদিনের মিত্র এবং আদর্শগতভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন। আওয়ামী লীগের মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতির কারণেই মূলত তারা এখন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। আর এ বিষয়টির কারণেই এবারের নির্বাচন ভোটারদের চোখে ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা পড়েছে।’
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে অংশগ্রহণের ঘাটতি ছিল, এবারেও তার অনেকটা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার কথায় সমর্থন দিয়ে পাশে থাকা আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘যে কারণে ২০২৪ সালের নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক ছিল না, একই কারণে এবারের নির্বাচনও পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, কিন্তু তাদের ভোটব্যাংক কিন্তু নির্বাচনে ঠিকই বড় ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের ভোটারদের একটা বড় অংশই ভোটকেন্দ্রে যাবে না বলে আমার বিশ্বাস।’
অন্যদিকে, গণভোট নিয়ে সংশয়ও ভোটারদের ভোটে অনীহা প্রকাশের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন রফিকুল আলম নামের এক ব্যক্তি। এই বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ‘গণভোটের কিছু ইতিবাচক দিক আছে, যা ভবিষ্যৎ সরকারকে আরও জবাবদিহির মধ্যে রাখবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এ বিষয়টি সমস্যাজনক।’
তার ভাষ্য, ‘অনেকগুলো শর্ত একসঙ্গে উপস্থাপন করে ভোটারদের শুধু “হ্যাঁ” বা “না” বলতে বলা হচ্ছে। শর্তগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটিতে কেউ কেউ সমর্থন দেবেন, আবার কোনো কোনোটি হয়তো তার মতের সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু “হ্যাঁ” ভোট দিলে সবগুলোতে সমর্থন দিতে হবে, আবার “না” বললে সবগুলো শর্তের বিরোধিতা করা হবে।
‘এই অবস্থা ভোটারদের চরম দ্বিধায় ফেলেছে। আর এর প্রভাব পড়তে পারে ভোটের দিন। অনেকে হয়তো এই দ্বিধার কারণেই ভোট দিতে যাবেন না।’
গণভোট নিয়ে দ্বিধার কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ নিরক্ষর এবং অনেক ভোটারই গণভোট ঠিক কী নিয়ে হচ্ছে, সেটাই ঠিক করে জানেন না। প্রশ্নগুলোই যদি বোঝাই না যায়, তাহলে সেই ভোট কতটা অর্থবহ হয়?’
সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের ব্যাপারে হতাশার কথাই জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে খুব বেশি প্রত্যাশা নেই। ভোট দেব, তবে এবার আমার ভোটটা হবে যাকে আমি তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করি এবং যারা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার পক্ষে।’
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি ভোট দেবেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের কোনো প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সামান্য অংশও বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝখান থেকে একটি গোষ্ঠী ব্যাপক লাভবান হয়েছে। এই নির্বাচনের পরও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’
এবারের নির্বাচনে নতুন প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে, আর তা হচ্ছে পোস্টাল ব্যালট, অর্থাৎ ডাকযোগে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি। আধুনিক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান কর্মরত ব্যক্তি, কারাবন্দি, এমনকি দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটাররাও নিজের প্রার্থীকে সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছেন।
নতুন এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে শুরুতে উদ্দীপনা লক্ষ করা গেলেও কার্যত তাদের তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি।
পোস্টাল ভোটের ব্যাপারে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি সুমাইয়া জান্নাত বলেন, ‘আমি এটাকে সত্যিকারের নির্বাচন মনে করি না। আমার কাছে এটা জনগণকে দেওয়া একধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার বলেই মনে হয়।’
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আরেক ভোটার কাশপিয়া বাঁধন বলেন, ‘এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আমার দল এবারের নির্বাচনে নেই। তাই আমি ভোট দিচ্ছি না।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আমি নই, আমার পুরো পরিবারই সেই দলকে সমর্থন করে। আমি যদি বাংলাদেশে থাকতাম, তাহলে ভয়ে হোক আর সামাজিক চাপে, আমাকে হয়তো ভোটকেন্দ্রে যেতে হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় আমার আর সেই বাধ্যবাধকতা নেই।’
তাই আওয়ামী লীগের ভোটের মাঠে না থাকা, গণভোটের জটিলতা—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটা বড় অংশের অংশগ্রহণ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণত ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ভোটারদের মাঝে অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা ততই কমে আসে। কিন্তু এবারের নির্বাচন ভিন্ন। আওয়ামী লীগের মতো প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিই ভোটের মাঠের প্রতিযোগিতার চিত্র বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
দলীয় সমর্থকদের বাইরে নিরপেক্ষ ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে ইনোভিশনের এ বিষয়ে করা জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলেও ১২ শতাংশ গণভোট প্রশ্নে সিদ্ধাহীনতায় ভুগছেন।
জরিপগুলো থেকে আরও দেখা যায়, অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সময়মতো নির্বাচন—এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা রাজনৈতিক বয়ান আর প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সমস্যা নিয়েই বেশি ভাবছেন।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারে আস্থা
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নানা প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা ও জল্পনা-কল্পনা হলেও নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত মিলেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে। অংশগ্রহণকারীদের ৮২ দশমিক ৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন, তারা ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন। (পিইপিএস রাউন্ড–৩: আস্থা সূচক)
এ থেকে বোঝা যায়, অনেক ভোটার ভোটদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীন থাকলেও ভোটের সুষ্ঠু আয়োজন নিয়ে তাদের মধ্যে আস্থা রয়েছে।
শেষ সময়ের হিসাব
সার্বিক দিক বিবেচনায়, তাই একেবারে অন্তিম সময়ে এসে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে নির্বাচনের ফল নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোট ভোটারদের বিরাট এই অংশ যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, তাহলে সমীকরণ একরকম হবে, আর তারা ভোট দিলে কে কোন প্রার্থী বেছে নেবেন, তার ওপর ফলাফলের অনেকটা নির্ভর করবে।
তাই প্রার্থীরা এই শ্রেণিকে কতটা নিজেদের দিকে টানতে পারবেন, কিংবা আদৌ পারবেন কিনা—শেষ সময়ে তা-ই হয়ে উঠেছে আলোচনা ও জল্পনার অন্যতম কেন্দ্র। তবে শেষ পর্যন্ত এই শ্রেণির ভোটাররা প্রতিটি আসনের ফল নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখেন, তা দেখতে সবার নজর এখন ১২ তারিখের ভোটে।
১১ দিন আগে
কুড়িগ্রামের চার আসনে নীরব ভোটারদের দিকে তাকিয়ে প্রার্থীরা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একেবারে শেষ সময়ে এসে কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশে মাঠ মুখর থাকলেও ভোটের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কে জয়ী হবেন, এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সরজমিনে স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকরা সক্রিয় থাকলেও প্রকাশ্যে মত দিচ্ছেন মাত্র ৩০ শতাংশ ভোটার। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নীরব, মুখ খুলছেন না তারা। ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থী ও সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যে প্রার্থী এই ভোটব্যাংক নিজের দিকে টানতে পারবেন, জয়ের পথে তিনিই এগিয়ে থাকবেন।
কুড়িগ্রাম-১
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা, ১১ দলীয় জোটের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী হারিসুল বারী রনি এবং গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা।
এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮১ হাজার ৪২৪ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৫১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন।
স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ধানের শীষ, ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের মধ্যে। তবে কে বিজয়ী হবেন তা এখনও অনিশ্চিত।
কুড়িগ্রাম-২
এ আসনে প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের ড. আতিক মুজাহিদ (শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির পনির উদ্দিন আহমেদ (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের অধ্যক্ষ নুর বখত (হাতপাখা), নাগরিক ঐক্যের মেজর (অব.) মুহাম্মদ আবদুল সালাম (কেটলি), সিপিবির নূর মোহাম্মদ (কাস্তে), এবি পার্টির নজরুল ইসলাম খান (ঈগল), স্বতন্ত্র প্রার্থী সাফিউর রহমান (হাঁস)।
এখানে মোট ভোটার রয়েছেন ৬ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯০, নারী ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৪১ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭ জন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজারহাট উপজেলায় হিন্দু ভোটারদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা পলাতক থাকলেও তাদের সমর্থক-ভোটাররা ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
কুড়িগ্রাম-৩
এ আসনের প্রধান প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী তাসভীর-উল ইসলাম, ১১ দলীয় জোটের ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী ড. মাহবুবুল আলম সালেহী, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী আব্দুস সোবহান সরকার, ইসলামী আন্দোলনের ‘হাতপাখা’র প্রার্থী ডা. আক্কাছ আলী সরকার, গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী নুরে এরশাদ সিদ্দিকী, স্বতন্ত্র ‘হাঁস’ প্রতীকের প্রার্থী সাফিউর রহমান।
এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০ জন। এর মাঝে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪ জন এবং নারী ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৬ জন।
এখানেও আওয়ামী লীগপন্থী ও হিন্দু ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এই ভোটব্যাংক নিজের দিকে টানতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম-৪
এই আসনের প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির আজিজুর রহমান (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের মোস্তাফিজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির কে এম ফজলুল হক মণ্ডল (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের হাফিজুর রহমান (হাতপাখা), বাসদ (মার্ক্সবাদী) রাজু আহমেদ (মই), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রুকুনুজ্জামান (বালতি)।
এ আসনে রয়েছে ভিন্ন মাত্রার লড়াই। আসনটিতে ধানের শীষ ও ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন আপন দুই ভাই।
ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন করেছে কুড়িগ্রামের এ এলাকাগুলোকে। পাশাপাশি ভাটিয়া ও উজানী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে সামাজিক বিভাজন। ফলে ভোটের মাঠে বিরাজ করছে নানা জটিল সমীকরণ।
কুড়িগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বিগত নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মানুষ ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার এখনও ভোটে অনাগ্রহী। তবে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলে শেষ মুহূর্তে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের চার আসনেই নির্বাচন নিয়ে উত্তাপ থাকলেও জয়-পরাজয়ের হিসাব এখনও অঙ্কের বাইরে, শেষ সিদ্ধান্ত নেবে নীরব ভোটারা—এমন অভিমত স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষক, ভোটার ও সচেতন মহলের।
১২ দিন আগে
ভোট নয়, টিকে থাকার দুশ্চিন্তায় কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়লেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এখানে ভোট নয়, মানুষের প্রধান ভাবনা—আগামী বছর বসতভিটা থাকবে তো? অসুস্থ হলে শহরে কি পৌঁছানো যাবে? সংসার চলবে কীভাবে আর সন্তানরা আদৌ শিক্ষার আলো পাবে কি?
ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালির আলগা, গোয়াইলপুরী, পূর্ব ঝুনকা, অষ্টআশির চর, চিড়া খাওয়া, খেয়ারচরসহ প্রায় ২০টি চরে বসবাসরত প্রায় ৫ হাজার ২০০ ভোটারের মধ্যে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। অনেকেই জানেন না ‘হ্যাঁ’ ভোট বা ‘না’ ভোট কী; এমনকি ভোটের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
চরাঞ্চলের মানুষের জীবন নদীনির্ভর ও অনিশ্চিত। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে এসব চর সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা।
কালির আলগা চরের বাসিন্দা জামাল বলেন, ‘ভোট দিয়ে কী হবে? নদী আইলে আইলে ভাঙে। আজ ঘর আছে, কাল নাই—এই চিন্তায় ভোট মনে আসে না।’
গোয়াইলপুরী চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ভোটের সময় কেউ আসে না। আর এলেও ভোট শেষ হলে আর খোঁজ থাকে না। তাই ভোট নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই।
চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক নিয়মিত না যাওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পূর্ব ঝুনকা চরের এক অভিভাবক বলেন, ‘স্কুল আছে, কিন্তু মাসে কয়দিন শিক্ষক আসেন, কেউ জানে না।’ বাচ্চারা পড়ালেখা থেকে পিছিয়ে পড়ছে বলে শঙ্কিত তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও নাজুক। স্থায়ী কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। চিড়া খাওয়া চরের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, অসুখ হলে নৌকা পাওয়াই মুশকিল। শহরে যেতে যেতে অনেক সময় চলে যায়। এই অবস্থায় ভোটের কথা ভাববে কে?
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘শুধু যাত্রাপুর ইউনিয়ন নয়, কুড়িগ্রাম জেলায় ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত চর ও দ্বীপচর মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪৬৯টি চর রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এসব চরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বলতে কার্যত কিছুই নেই।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে রাজনৈতিক নেতারা যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে চরবাসী। ফলে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহ খুবই কম।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, ‘দারিদ্র্যের দিক থেকে ৬৪ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম প্রায় তলানিতে অবস্থান করছে। ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ মানুষ দরিদ্র। চরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি।’
তিনি বলেন, ‘গত পতিত সরকার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় শুধু চরাঞ্চল নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভোটের প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে। আমার হিসেবে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নীরব অবস্থানে রয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত জটিল। কোন প্রার্থী জয়ী হবে, তা অনুমান করা কঠিন।’
চরবাসীদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের তেমন আনাগোনা নেই। প্রচারণা শহর ও মূল ভূখণ্ডেই কেন্দ্রীভূত থাকে। চরগুলো এসব কার্যক্রম থেকে কার্যত উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
খেয়ারচরের যুবক আল আমিন বলেন, ‘ভোটের জন্য কেউ আসে না, বোঝায় না। উন্নয়ন না হলে ভোটে আগ্রহ আসবে কীভাবে?’
চরবাসীরা বলছেন, তারা ভোটের বিরোধী নন। তবে ভোটের আগে নয়, ভোটের পর বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। নদীভাঙন রোধ, স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলেই ভোটের গুরুত্ব তাদের কাছে নতুনভাবে ধরা দেবে। তাদের একটাই দাবি, ভোটের আগে চাই বাঁচার নিশ্চয়তা; উন্নয়ন এলে ভোট আপনাতেই গুরুত্ব পাবে।
১৩ দিন আগে
চরম জনবল সংকটে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, নষ্ট হচ্ছে ১৫৩ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
দীর্ঘদিন ধরে জনবল-সংকটে ধুঁকছে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। চার ভাগের এক ভাগ কর্মচারী দিয়ে চলছে দেশের বৃহত্তম এই রেলওয়ে কারখানার কার্যক্রম। জনবলের অভাবে পড়ে আছে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানিকৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি, যা ব্যবহারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় তীব্র কাঁচামাল-সংকট দেখা দিয়েছে। এসব কারণে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, আসাম–বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে ১৮৭০ সালে স্থাপিত হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। ১১০ দশমিক ২৯ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় রয়েছে ২৭টি শপ (উপকারখানা)। এখানে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ এবং মালবাহী যান (ওয়াগন) মেরামতের কাজ করা হয়। পাশাপাশি রেলওয়ের স্টিম রিলিফ ক্রেন এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্যারেজ ও ওয়াগন মেরামত করা হয়ে আসছে। এছাড়া ক্যারেজ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের প্রায় ১ হাজার ২০০ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি হয় এই কারখানায়।
ক্ষমতা ও গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানাটির আধুনিকায়ন করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী বগি এবং ওয়াগন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৭টি ওয়ার্কশপের সংস্কার করা হয়। ৪৩ ধরনের যান্ত্রিক (মেকানিক্যাল) এবং ১৩ ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয়। এছাড়া গভীর নলকূপ স্থাপনসহ একটি ওভারহেড পানির ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হয়। তবে দক্ষ জনবল না থাকায় এই আধুনিকায়নের কোনো বাস্তব সুফলই মিলছে না।
সূত্র জানায়, বর্তমানে কারখানাটিতে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীর মোট পদ ২ হাজার ৮৫৯টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৭১৬ জন। অর্থাৎ ২ হাজার ১৪৩টি পদই রয়েছে শূন্য। এই জনবল-সংকটের কারণে ক্যারেজ মেরামতের দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন তিনটি কোচ মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে দুটি। ২৭টি শপে থাকা ৭৪০টি মেশিন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিকও নেই।
১৭ দিন আগে